আফগানিস্তানে শান্তি এখনও সুদূরপরাহত!

  •  
  •  
  •  
  •  

বিল্লাল বিন কাশেম: আফগানিস্তানের একটি প্রজন্ম যুদ্ধকে এখন তাদের জীবনের অংশ বলেই মনে করে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর দেশটিতে যেসব শিশুর জন্ম হয়েছিলো তারা যুদ্ধের দগদগে ক্ষত দেখতে দেখতে বড় হচ্ছে।

কিন্তু গত ২৯ ফেব্রুয়ারি তালেবান ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যকার চুক্তি এসব মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছিল।

কোটি কোটি আফগান’সহ বিশ্বের অন্যান্য শান্তিকামী মানুষ মনে করেছিলেন-আফগান শিশুদের আর অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখতে দেখতে বড় হতে হবে না।

দীর্ঘ মেয়াদী ও উদ্দেশ্যহীন এক যুদ্ধ হতে হয়ত দেশটি পরিত্রাণ পাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় মনে হচ্ছে শান্তিকামী আফগানদের সেই স্বপ্ন এখন সুদূর পরাহত।

কারণ চুক্তি স্বাক্ষরের ঠিক কয়েক দিন পর কাবুলে হঠাৎ করে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা হয়। এতে প্রায় ৩০ নিরপরাধ প্রাণ হারান।

হামলা থেকে ন্যানো সেকেন্ডের ব্যবধানে রক্ষা পান দেশটির শীর্ষ নেতা আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহ। এরপরও কয়েক দফা হামলা হয়েছে।

এসব হামলায়ও বহু হতাহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং আফগান তালেবানের মধ্যে কাতারের দোহায় মার্কিন সেনা প্রত্যাহার নিয়ে চুক্তি হওয়ার পর কাবুলে এটিই প্রথম বড় ধরনের হামলা।

তালেবান অবশ্য এক বিবৃতিতে এ হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে। আফগানিস্তানে দীর্ঘ ১৮ বছরের লড়াই বন্ধে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র দুইদিন পর অর্থাৎ গত সোমবার দেশটির খোস্ত প্রদেশে একটি ফুটবল ম্যাচ চলাকালে আচমকা জঙ্গী হামলা হয়।

এতে অন্তত তিন জন নিহত ও বহু লোক আহত হয়। তবে সহিংসতার এই ঘটনায় সাধারণ জনতা বিস্মিত হয়নি।

তারা মনে করে প্রকৃত শান্তি স্থাপন এ চুক্তির উদ্দেশ্য নয়। এই শান্তি প্রক্রিয়াকে দাবার চাল হিসেবে ব্যবহার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে-এর সুফল ঘরে তুলতে মরিয়া ঝানু ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এ কারণেই আফগানিস্তান ও দেশটির সীমান্ত নিয়ে ট্রাম্পের কোন মাথাব্যথা নেই। তাই নির্বাচনের বছরে বিদেশ থেকে সৈন্যদের অসম্মানজনক পিঠটানকে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে তালেবানের জন্য একটি বিশেষ ছাড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই কাবুল সরকারকে তালেবানের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদন বিষয়ে বলে আসছিল।

আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি ইতিমধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার তালেবান নেতার মুক্তি দিতে অসম্মতি জানিয়েছেন।

তিনি সাফ বলেছেন, আন্ত:আফগান শান্তি আলোচনার আগে কাউকে ছাড়া হবে না। অনেক বিশ্লেষক তালেবানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের এই চুক্তিকে ট্রাম্প প্রশাসনের তালেবানের পক্ষে ধামাধরা পদক্ষেপ আখ্যা দিয়েছে।

কারণ তালেবান আফগানিস্তানে যে ‘ইসলামী আমিরাত’ কায়েম করেছিল-যুক্তরাষ্ট্র তার স্বীকৃতি দেয়নি। তাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায় করতে পারলে-তারা আফগানিস্তানের বর্তমান সরকারের স্বীকৃতি সহজ হয়ে যাবে।

আবার যখন তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফা চুক্তি হবে-তখন তালেবান আফগানিস্তানে আর মার্কিন হস্তক্ষেপ মানতে চাইবে না।

চুক্তির পর কাবুলের বর্তমান সরকার মনে করছে, তালেবান সরকার কখনও দেশে শান্তি চায় না। তাই তারা এখন মার্কিন সরকারের স্বীকৃতি আদায়ে মরিয়া।

আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের হঠাৎ রণেভঙ্গের ঘটনায় তালেবান ও তাদের পাঁচ সমর্থক পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ছাড়া কোন পক্ষই খুশি হতে পারেনি।

প্রতিবেশী ভারত আফগান সরকারের ওপর বরাবর তাদের সমর্থন বজায় রেখেছে। দিল্লী মনে করে একমাত্র কাবুল সরকারই দেশটিতে শান্তি স্থাপনের কাণ্ডারি হতে পারে।

আবার শান্তির পক্ষে কাজ করা আফগানরাও এই চুক্তি নিয়ে কিছুটা নিরাশ। আফগানিস্তানের প্রখ্যাত মানবাধিকার সংগঠন আফগান ওমেন্স নেটওয়ার্কও-এ চুক্তি বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করছে।

তারা মনে করছে, আন্ত:আফগান শান্তি আলোচনায় পর্যাপ্ত নারী প্রতিনিধি রাখা নাও হতে পারে। আবার সেই তালেবান যুগ ফিরে আসে কি না-এ প্রশ্ন আফগান নারীদের মাথায় নিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে।

তবে তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ চুক্তির পর পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী তাদের উল্লাস গোপন করতে পারেনি।

চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই সাবেক এক পাক জেনারেল টুইটারে বলেন, আফগান তালেবানের জন্য-এ এক বিশাল বিজয়।

অপরদিকে ভারত তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেকার চুক্তিতে ইতিবাচক কিছু দেখছে না। তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ছাড়’ মনে করছে নয়া দিল্লী।

ট্রাম্প ভারতে বিশাল সম্মানসহ ভারত সফর শেষ করার পরপরই এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

দেশটি মনে করছে, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তালেবানের একমাত্র ও ঘনিষ্ঠ সমর্থক যা ভারতের জন্য সুখকর নয়।

বিল্লাল বিন কাশেম, সাবেক কূটনৈতিক প্রতিবেদক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক।
ব্লুমবার্গ অনলাইন অবলম্বনে।

ঢা/তাশা

মার্চ ১১, ২০২০ ১২:২২

(Visited 28 times, 1 visits today)